Jobanআমেরিকা কেন ইসরাইলের স্বার্থেই কাজ করে?

আমেরিকা কেন ইসরাইলের স্বার্থেই কাজ করে?

‘ইউনাইটেড স্টেট অলওয়েজ উইথ ইজরায়েল’ একেবারে স্পষ্ট কথা, একদম সাফ কথা। গত নির্বাচনের আগে ২০১৬ সালের নভেম্বরে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আমেরিকার ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল পার্টির নেতা এবং সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্ত্রী হিলারী ক্লিনটন একটি নির্বাচনী সভায় এ কথা বলেন ।

খেয়াল করার বিষয়, তিনি বলেন নি ডেমোক্রেটরা ইসরাইলের পাশে সর্বদা। মানে তার কথাতেই এটা পরিস্কার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যে-ই হোক, যে-দলেরই হোক, তিনি ইসরাইলের পাশে থাকেন। আসলে ঠিক পাশে থাকা নয়। পাশে থাকা মানে বোঝায় বিপদের সময় পাশে এসে সাহায্য করা। আমেরিকা মূলত ইসরাইলের স্বার্থে লড়াই করে আসছে। মানে ইসরাইলের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারলে আমেরিকার সুবিধা মিলবে এরকম একটা হিসাবও দেখতে পাওয়া যায়। আবার আমেরিকারই নানা মিডিয়ার বিশ্লেষণ দেখায়, ইসরাইলের স্বার্থে যুদ্ধ লাগিয়ে আমেরিকার জনগণের ক্ষতি হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, আমেরিকার প্রধান দুই দলের নেতাদের কথা মানেই সকল আমেরিকানদের কথা নয়। এই দুই দলের বাইরেও অনেক আমেরিকান আছেন। যারা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। কিন্তু এই দুই দলের ভোটার বেশি থাকার কারণে তাদের কথাই গুরুত্ব পায়। আর সারা দুনিয়া জানে, আমেরিকার প্রশাসনে যায়নবাদী প্রেশার গ্রুপ খুব শক্ত। পদাধিকার বলে তারা সরকার প্রধান যে-ই হোক তাকে কাবুতে রাখে। যায়নবাদীরা রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট, এই দুই তরফে গুটি চালাচালি করে আসছেন। আবার অন্য দলের জন্যেও খরচ করে ‘একটা জুইত’ করবার জন্যে। মানে অল্প মেয়াদের আপন করা আর পরে আছাড় মারা।

একটু পিছনে নজর ফেললে বিষয়টি পরিস্কার হবে। রিপাবলিকান দল থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্দেশে আমেরিকার নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী ইরাকের সাথে অসম যুদ্ধে নেমেছিল। হালকা প্রতিরোধ মোকাবলা করে তারা দখলে নেয় ইরাক। সাদ্দাম হোসেনকে শেষ পর্যন্ত ফাঁসিতে লটকায় আমেরিকার তাবেদার সরকার। ২০০৩ সালের ৬ মার্চ ডব্লিউ বুশ ঘোষণা করেছিলেন:

“I believe Saddam Hussein is a threat to the American people. I believe he’s a threat to the neighborhood in which he lives. And I’ve got good evidence to believe that. He has weapons of mass destruction… The American people know that Saddam Hussein has weapons of mass destruction.”

পুরা ব্যাপারটাই কিন্তু ডাহা মিছা। মাস ডেস্ট্রাকশনের কিছুই ছিল না ইরাকে। আমেরিকার অনেক বুদ্ধিজীবিও মিডিয়ায় গুরুত্বসহকারে বলেছিলেন আগ্রাসন না চালাতে। কারণ ওখানে ওসব বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল মারণাস্ত্র কিছু নাই। তবু কেন বুশ ইরাকে আগ্রাসন চালাতে অনড় থাকলেন?

কারণ ইসরাইলি যায়নবাদীদের কথা দিয়েছিলেন যুদ্ধে যাবেনই। ওয়াদা তারা আদায় করে নিয়েছিলেন। ওদের যুদ্ধ দরকার নানা কারণে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যায়নবাদীরা দুই পক্ষে সহায়তা দিয়েছিল। এমনকি হিটলারের নাজি বাহিনীকে পরিপুষ্ট করেছিলেন ইহুদী পরিচয়ের যায়নবাদীরা। কিন্তু ট্রাজেডি হল, পরে নাজি বাহিনী আর তাদের রাজাকারেরা প্রায় ছয় মিলিয়ন ইহুদী হত্যা করেছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডকেও যায়নবাদীরা কাজে লাগিয়েছেন। মানে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ‘প্রধান কারণ’ হিসাবে দেখায় দুনিয়াকে। মানে যায়নবাদীরা আওয়াজ তোলেন জোরেশোরে যে, ইহুদীদের জন্যে নিরাপদ দেশ সুলাইমান আঃ এর রাজ্য ‘কিংডম অব ইজরায়েল’ এ ফিরে যেতে দাও। এজন্যে পশ্চিমের সাহায্য করা উচিত। উচিত কেন? এর একটা ধর্মীয় কারণ পরে আসছে।

যায়নবাদীরা আসলে ধনকুবের গোষ্ঠী। এদের মূল শক্তি ‘রথচাইল্ড ব্যাংকিং পরিবার’। পর্যবেক্ষকদের কেউ বলেন, ‘ইহুদীদের জন্যে নিরাপদ স্থান’ দাবী নিয়ে উচ্চকিত যায়নবাদীরা নিজেদের মানুষকেও হত্যা করায়। এর একটা দৃষ্টান্ত হল, অই হলোকাস্ট বা জার্মান ইহুদী গণহত্যা। মূল টার্গেট নিজেদের অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা অটুট রাখা। (যায়নবাদের গোড়া ইত্যাদি বিষয়ে আরও কিছু তথ্য পাবেন আমার আগের রচনা ‘জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জ, যায়নবাদ, নিউ ইয়র্ক টাইমস ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’-তে।)

বুশ জুনিয়রের আমলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কণ্ডোলিজা রাইসও পরিস্কার দুনিয়াকে জানিয়েছিলেন, ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে সমগ্র দুনিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল যায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল! প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা যায়, মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ ২০০৩ সালের ১৬ অক্টোবর পুত্রজায়াতে ওআইসি-র সম্মেলনে বলেছিলেন-

“Jews rule the world by proxy. They get others to fight and die for them.

কথাটা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আসার পর পক্ষে-বিপক্ষে বেশ হৈ চৈ হয়েছিল। সিএনএন-র রিপোর্টে বলা হয়, আমেরিকা ও ইসরায়েল মাহাথিরের কথাকে ‘পোলারাইজিং রেটোরিক’ বা ‘নতুন অর্থের চটকদার বুলি’ বিবেচনা করেছিল। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ইসরাইল বলেছিল, ‘মাহাথির মুসলমানদেরকে উস্কে দিচ্ছেন ইহুদিদের উপর আক্রমণ করতে।’ ইসরায়েল আরো বলেছিল, ‘এ তো গায়ে পড়ে ঝগড়া লাগানো বা তোমার হেঁডম থাকলে আও দেখি চান্দু– এমন আহবান’।

আসলে ড. মাহাথির একটু ভুল বলেছিলেন মনে হয়। তিনি ইহুদী না বলে যায়নবাদী বললেই সংগত হতো। কারণ দুনিয়াতে যথেষ্ট ইহুদী আছেন যারা যায়নবাদী না। তারা যায়নবাদী ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বিরোধী। তবে মাহাথির ঠিক ধরতে পেরেছিলেন ইহুদী পরিচয়ের যায়নবাদীরা অপরের মাধ্যমে দুনিয়া শাসন করছে। তারা অন্য মানুষের জীবন বরবাদ করে নিজেদের স্বার্থে।

সাবেক লুজিয়ানা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-র সদস্য, যিনি একজন রেসিয়েল রিয়েলিস্ট– মানে সকল জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য লালন করবার অধিকার সমর্থনকারী। তিনি ডেভিড ডিউক, তিনি যায়নবাদী তৎপরতার ব্যাপারে বিস্তর লেখেন, তিনি একজন শাদা জাতীয়তাবাদী, তিনি যায়নবাদী ষড়যন্ত্রের তত্ত্ববিদ, তিনি হিউম্যান ফ্রিডমের পক্ষে, বৈচিত্রের পক্ষে। তিনি যায়ও-গ্লোবেলিজমের zio-globalism চিন্তা খুলেমেলে দেখান। তিনি দেখান, ২০১৫ সালের ২ মার্চ কংগ্রেসে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বক্তৃতাতেই এটা স্পষ্ট যে, আমেরিকা সুপারপাওয়ার না, সুপারপাওয়ার হলো যায়ও-গ্লোবেলিজম। মানে যে-গোষ্ঠী ইসরাইল চালায়, সে-গোষ্ঠী আমেরিকার রাজনীতি, অর্থনীতি, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

এছাড়া আমেরিকার একজন বিখ্যাত ইহুদী সাংবাদিক, ওয়াটারগেট কেলেংকারি উদঘাটনের অন্যতম অনুসন্ধানী কার্ল বার্নস্টাইন ২০১৩ সালের ৪ মে এমএসএনবিসি টিভি-র ‘মর্নিং জো’ টক শো-তে সাফ বলেছিলেন, ইসরাইলি নিওকনজার্ভেটিভেরা আমেরিকাকে ইরাক যুদ্ধে যেতে বাধ্য করেছিল তাদের স্বার্থে। ইনি সেই বার্নস্টাইন, যিনি আর বব উডওয়ার্ড মিলে প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রশাসনের ‘ডার্টি ট্রিক্স’ বের করে দিয়েছিলেন, যা ‘ওয়াটারগেট কেলেংকারি’ নামে খ্যাত। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে প্রেসিডেন্ট নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ঐ টিভি টক শো-তে বার্নস্টাইন বলেছিলেন, “একটা বিনাশি যুদ্ধ করল আমেরিকা সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে। আর ঐ যায়নবাদীদের মিথ্যাকে সমর্থন করেছিল নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ তাদের নিয়ন্ত্রিত সম্প্রচার মাধ্যমগুলো।”

আসলে কয়েক ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের অই যুদ্ধে শুধু ইরাকের মানুষ নিহত আহত হয় নি। শত শত আমেরিকানের ব্রেইন ইনজুরি, মনস্তাত্ত্বিক বিকলতা পেয়েছে। আর প্রাণ তো গেছেই অনেকের। এছাড়া প্রতি বছর ইসরাইলকে আমেরিকা প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ইউএস ডলার সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এসব ব্যাপারের গোপন কারণ যায়নবাদীদের টাকা ও কৌশলের শক্তি বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন। তাদের এই শক্তি আমেরিকার ভেতরেই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে পাকাপোক্ত হয়ে আছে। মানে, নানা প্রকার চুক্তি/শর্তের অধীন হয়ে ইসরাইলকে দিতে বাধ্য হচ্ছে আমেরিকা। যদিও এবার Moody’s corporation এর গ্লোবাল ক্যাপিটেল মার্কেটস গবেষণা দেখাচ্ছে, নভেম্বরের ইউএস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রেজাল্ট, ডেমোক্রেট থেকে হোক বা রিপাবলিকান থেকে প্রেসিডেন্ট হোক, বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর প্রধান কারণ, কিছু দেশের সাথে আমেরিকার ব্যবসা ও মিলিটারি চুক্তিতে রদবদল আসতে পারে।

এখন দেখা যাক, ইসরাইলের জন্যে আমেরিকা লড়াই করবার পরিস্কার কারণ কী?

বিশ্বরাজনীতি পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, যারা আমেরিকার এলিট শ্রেণী, যারা নিজেদেরকে সমাজের আপারক্লাস মনে করে, যারা ধন-দৌলতে বলবান, যারা বড় বড় ব্যবসা করেন, যারা সরকার চালাতে ক্ষমতা পায়, তারা ইসরাইলকে সহায়তা করা সমর্থন করেন তাদের স্বার্থে। ইসরাইল তাদের বড় ব্যবসার সুযোগ দেয়। ইসরাইল নিজে মোটা দাগের ইম্পোর্টার। অই এলিটদের ইহুদী বা খৃষ্টান পরিচয় মূখ্য ব্যাপার না। তারা আসলে ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকান বা লিবারেল বা কনজার্ভেটিভ পরিচয় উপরে-উপরে ব্যবহার করে কেবল। আসলে ওসব পরিচয় তাদের দিলে-মনে নাই। তারা চায় তাদের এলিটিজম জিইয়ে রাখতে যেকোনো উপায়ে। তারা নিজেদেরকে সুপেরিওর মনে করে। মুসলিম পরিচয়ধারী অনেক এলিটও আছে দেশে দেশে। মধ্যপ্রাচ্যে আরব এলিটিজমও শক্তপোক্ত।

কারো মতে, মসিহি একটা ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমর্থনও পায় ইসরাইল এই কারণে যে, বাইবেলে বলা আছে, ইহুদীদের দেশটাতেই ঈসা নবী পুনরায় আসবেন। তাই তাদের দেশটা হেফাজতে রাখবার দায় আছে খৃষ্টানদের উপর। তাদের কাছে ইতিহাসের জ্ঞান নাই। তারা গভীরভাবে কোনো বিষয় বুঝতেও চান না। তারা একটা ধর্মীয় অন্ধতা লালন করাকেই আলোকিত থাকা মনে করেন। অথচ ইসরাইল রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠারই বিরোধিতা করেন আমেরিকার হাজার হাজার ইহুদি ধর্মাবলম্বী। যারা হিংসা হানাহানি, ধর্মীয় বিভেদ চান না মোটেই। এছাড়া কিছু পর্যবেক্ষক এও দেখান, আমেরিকার সরকার চালাতে যে-ই আসুক। তারা জানে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলই আমেরিকার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মোসাদের কাছ থেকে সিআইএ প্রয়োজনীয় তথ্য পায়।

আর যদি আমেরিকা সমর্থন না করে ইসরাইলকে, তাইলে কী হবে? এ প্রশ্নের উত্তর দেন অবসরপ্রাপ্ত ইউএস জেনারেল বয়কিন ‘মর্নিংস্টারটিভি’র সাক্ষাতকারে। বলেন, ‘‘এই আখেরি জমানায় আমেরিকা যদি ইসরাইলের পাশে না থাকে, তাইলে আমেরিকাকে শাস্তি পেতে হবে।’’ বুড়ো বয়কিনের কথাকে কেউ বয়িশ বা বালকসুলভ মন্তব্য বিবেচনা করতে পারেন। ওটা তার ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা। অন্যভাবে বলা যায়, যদি আমেরিকা-ইসরাইল মিত্রতা এমন মতলবি পর্যায়ের না হত, এলিটিজম আর যায়ো-গ্লোবেলিজমের দৌরাত্ম্যে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হত না।

প্রসঙ্গত এটাও উল্লেখযোগ্য যে, রিপাবলিকান দলেরই সাবেক ডেপুটি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও জর্জ বুশ জুনিয়রের উপদেষ্ঠা পল ওলফোউইজসহ সাবেক পঞ্চাশ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে আমেরিকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। কারণ ট্রাম্প আমেরিকার মিত্রদের পাত্তা না দিয়ে শত্রুদের পক্ষে কথা বলছেন। ওলফোউইজ নিজেও ডেমোক্রেটের হিলারিকে ভোট দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন। আর সাবেক ডিফেন্স সেক্রেটারি রবার্ট গেইটস সাফ বলে দিয়েছেন, ‘ট্রাম্প ত মেরামতযোগ্য নহে।’