Jobanএফোরিজমের বিপরীতে এফোরিজম থাকে কেন?

এফোরিজমের বিপরীতে এফোরিজম থাকে কেন?

aphorism মানে জীবন সংশ্লিষ্ট গভীর message, মানে word, মানে চিন্তা বা ধারণা, মানে saying মানে dictum মানে principle, মানে formula মানে নীতিকথা। একটা পদ্ধতির ভেতরের বাস্তবতা খুলেমেলে দেখে গুণীজন দেখান এর মিকানিজমের সারাৎসার। কিন্তু কেন এক এফোরিজমের বিরুদ্ধে অন্য এফোরিজম দেখতে পাই আমরা? বিরুদ্ধে-যে দেখা যায়, তা আসলেই বিরুদ্ধে কি?

উত্তর— না, বিরুদ্ধে না। কিন্তু দেখা যায় বিরুদ্ধেই।

দেখা যায় আকাশ একটি নীল ছাদ যেন, আসলে ত অমন কোনো আচ্ছাদন বা ছাত নাই, কেবল দেখা যায়। দেখা যায়, দিগন্তে আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমাচ্ছে। আসলে ত আকাশ দূর বহুদূরের ভেলকি। দেখা যায়, মানুষটি কাঁদছে। আসলে দুঃখ পেয়ে কাঁদছে না, এসপিওনেজ তৎপরতার অংশ হিসাবে অন্য একটা মতলব পাওয়ার জন্যে কান্নার অভিনয় করছে।

সে-যাক, এই যে Face is the index of mind. আর Appearances are deceptive. এই দুই এফোরিজম দেখা যাচ্ছে পরস্পরবিরোধী। প্রথমটির সাধারণ বাংলা অর্থ চেহারায় মনের মতলব ভাসে। দ্বিতীয়টি বলছে চেহারাতে মনের ভেতরের মতলব কেবল ভাসে না নয়, চেহারা ধোঁকাও দেয়। এই দুই এফোরিজমই বাস্তবতা থেকে এসেছে। এভাবেও আছে ওভাবেও আছে। এছাড়া অন্যভাবেও থাকতে পারে। জগতের ব্যাপার ত শুধু আমার বা আপনার পছন্দের প্রসঙ্গ নিয়ে নয়। আমার চিন্তার বিপরীতে অনেক চিন্তা থাকবার যুক্তিও আছে। জগত ত সব নিয়ে। সহজ কথায়, একটা এফোরিজম এক ধরনের সেট অব কনডিশন্স দেখায়, আর এর বিপরীত অর্থবোধক এফোরিজম অন্য সেট অব কনডিশন্স সামনে আনে। এই দুই এফোরিজম দ্ব্যর্থব্যঞ্জক নয়।

আরেকটু ভিতরে গিয়ে দেখতে পারি আমরা। ক্ষুব্ধ লোকটির চেহারা দেখে চেনা যায়,কোনো কারণে সে ক্ষুব্ধ। লোভী মানুষটির হাবভাব তার চেহারায় ফোটে। মুখের মাঝে ভাসে মানুষটি শান্ত না অশান্ত। তার নাক কান চোখ কপাল কপোল আইব্রু ঠোঁট চুল ভাব প্রকাশ করে। এছাড়া নজর রাখা, মুখভঙ্গী, হাঁটাচলা নড়াচড়ার ভঙ্গীতেও মনোভাব প্রকাশ পায়। মনের প্রফুল্লতা, দুঃখবোধ তার মুখমণ্ডলে এসে হাজির হয়। সে ইচ্ছে করলেও লুকাতে পারে না তার মনোভাব। অন্যদিকে পরিকল্পিত এসপিওনেজ মিশনে আসা লোকটি সচেতনভাবেই কৃত্রিম ভাব প্রকাশ করে ভেতরের ভাবকে আড়ালে রাখে। সাধু সেজে শয়তানি করে। তার চেহারার ভাবভঙ্গীতে অনেক মানুষ ধোঁকা খায়। কেউ প্রয়োজনে চোর ধরতে চোর সাজে। অনুসন্ধিৎষু মানুষ, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ, ভেতর বাহিরের মিল পেতে নিজের মাঝে প্রশ্নোত্তর চর্চা করে-করে বুঝ পেতে চান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা গরমিলের ব্যাপারটা দেখে ফেলেন। তবে কিছু ঊণ থাকে কখনও। কখনও বরাবর ধরেও ফেলেন হিসাব মিলাতে মিলাতে। তখন দেখেন ঐ লোকটির কান্না আসলে কান্না না, কান্নার ভান। সাধারণভাবেও সকল সমাজেই মানুষ ইচ্ছে করে বা অনিচ্ছায় বাধ্য হয়ে, প্যাঁচে পড়ে, ঠেকে গিয়ে বিপদমুক্ত হতে ভেতরে একটা বাইরে আরেকটা ভাব নিয়ে চলে। নিজে বাঁচতে আরেকজনকে ঠকে। ঠকতে গিয়ে নিজে নতুন বিপদেও পড়ে। নানাবিধ সংস্কারের অধীনে মানুষের নানাবিধ আকাঙ্খা মানুষকে হুলস্থুল ডামাডোলে রাখে। এর মাঝে তাদের মুখমণ্ডলে অকৃত্রিম ও কৃত্রিম মনোভাব জ্বলে আর নিভে। এই করে-করে এক সময় জীবনটাই নিভে যায়।

এছাড়া মুখাকৃতি বিচারপূর্বক চরিত্রনির্ণয়বিদ্যা-যে একটা আছে, যেটিকে ইংরেজিতে বলে physiognomy (ফিজিওনমি), এ-থেকে কখনও আট/দশ/বার/চৌদ্দ আনা বুঝ পায় মানুষ। মানুষ কেবল বই পড়ে না, মানুষ মানুষের নাক মুখ চোখ কান কপাল ইত্যাদিসহ মুখমণ্ডল পড়ে। যারা লেখাপড়া শিখে বই পড়তে পারে না, তারাও প্রতিদিন অন্যের মুখমণ্ডল পড়ে। পড়ে বুঝ পায়, হিসাব করে, বহুবিধ সম্পর্ক রচনা করে ও ভাঙ্গে।

 

এই যে Face is the index of mind. আর Appearances are deceptive. এই দুই এফোরিজম দেখা যাচ্ছে পরস্পরবিরোধী। প্রথমটির সাধারণ বাংলা অর্থ চেহারায় মনের মতলব ভাসে। দ্বিতীয়টি বলছে চেহারাতে মনের ভেতরের মতলব কেবল ভাসে না নয়, চেহারা ধোঁকাও দেয়। দুই এফোরিজমই বাস্তবতা থেকে এসেছে। এভাবেও আছে ওভাবেও আছে। এছাড়া অন্যভাবেও থাকতে পারে। জগতের ব্যাপার ত শুধু আমার বা আপনার পছন্দের প্রসঙ্গ নিয়ে নয়। আমার চিন্তার বিপরীতে অনেক চিন্তা থাকবার যুক্তিও আছে। জগত ত সব নিয়ে

 

কেউ গোলগাল মুখাকৃতি পছন্দ করেন। কারণ ফিজিওনমি তাকে জানিয়েছে, হৃষ্টপুষ্ট মাংসল চেহারার এই মানুষ সুচেতা/যত্নশীল/উদ্যমশীল হয়ে থাকেন। ওদের শক্তপোক্ত সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি থাকে। আর লম্বা পাতলা আয়তাকার মুখের মানুষের মাঝে নার্সিসিজম থাকে। এরা বাস্তববাদী হয়ে থাকেন।

এভাবে নানা মুখাকৃতির নানা বৈশিষ্ট্যের কথা ঐ নির্ণয়বিদ্যাতে আছে। এ আলাপে ঐ বিদ্যা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ মূখ্য নয়। এখন, কেউ বলতে পারেন, গোলগাল চেহারার মানুষ অযত্নশীল হতেও ত দেখা যায়। যায়। কেন যায়? যদি এমন হয়, এই চেহারার মানুষটি কোন কারণে বিক্ষিপ্ত বা বিকারগ্রস্থ বা গভীর হতাশায় নিমজ্জিত, তাইলে তার স্বভাবের বিপরীত আচরণ প্রকাশ পেতেই পারে। মানুষটি যখন কোনো মানসিক জটিলতায় ভোগে। যেমন: হীনমন্য ভাব (ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স), তখন তার শ্রেষ্ঠত্বের ভান (সুপেরিওরিটি কমপ্লেক্স) হয় মনস্তাত্ত্বিক ডিফেন্স মিকানিজম অবলম্বন। জানালেন আলফ্রেড এডলারেস তার বই “Understanding Human Nature”-এ। এমন হওয়াও বাস্তবতার ভেতরের ব্যাপার। তখন তার এপিয়ারেন্স প্রতারণা করতে পারে।

উল্লেখ্য, মনোবিশ্লেষণ ও চরিত্রনির্ণয়বিদ্যা বর্তমান দুনিয়ার দেশে দেশে গোয়েন্দা তৎপরতায়, কাস্টম চেকিংয়ে, মিলিটারি ইনটেলিজেন্স-এ, এবং সরকারের স্বার্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। এক গবেষণা দেখিয়েছে ফেইস রিডিংয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মানুষটির মেন্টাল ডিজঅর্ডার বা সিজোফ্রেরেনিয়া আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা টের পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া হাতের আঙ্গুলের দৈর্ঘেও তারা ইশারা পাচ্ছেন। অনামিকার তুলনায় তর্জনির দৈর্ঘ কম হলে সেখানে সিজোফ্রেনিয়ার সম্ভাবনা দেখতে পান। (An alternative study examined the risk of schizophrenia as determined by finger length. The researchers found that the ratio of the lengths of the index finger and the ring finger in males is associated with a higher risk of schizophrenia. When the index finger is shorter than the ring finger it leads to a smaller 2D:4D ratio which suggests a higher exposure to testosterone whilst in the uterus.)

যাহোক এখানে মূল আলাপ— একটা এফোরিজমের বিপরীতে আরেকটা এফোরিজম থাকাও যে বাস্তব সেটা। আবার একটু আলাপ— এই যেমন ধরা যাক “যেমন কর্ম তেমন ফল”। এর ভেতরে বাস্তবতার নীতি আছে। কখনও যেমন কর্ম তেমন ফল না হতে পারার কারণও থাকতে পারে। কারণের দিকেও নজর রাখতে হয়। কারণ থাকে। কারণ-যে থাকে এরও কারণ আছে।  এমন হচ্ছে, হয়ে চলছে। ক্ষুদ্র পরিসরে হচ্ছে, বড় পরিসরেও হচ্ছে। কিন্তু কখনও বিশেষ কারণে উল্টা রিএকশন দেখা না যেতে পারে। সময় সাপেক্ষে, রিএকশন প্রকাশ পেতে দেরী হতে পারে। অথবা আরেকটি ঘটনার বিশেষ সম্পর্ক থাকায় প্রতিক্রিয়া ফুটবেই না। না-ফুটলেই এফোরিজম-টি মান্দা হয়ে যাবে না।

আচ্ছা, “every action has an equal and opposite reaction” এর জায়গায় লিখলাম “Every aphorism has an equal and opposite aphorism”, কি দাঁড়াল? হুলস্থুল ব্যাপার! শত শত নীতিবাক্য মুখোমুখী খাড়া করা যাবে। “Birds of a feather flock together.” ঠিক আছে। পাখির ডানার পালকগুলো সমানতালে ঝাপটায় বলে পাখি উড়তে পারে, কিন্তু ঐপাশে দেখেন “Opposites attract.”। বিপরীতের আকর্ষণে জগত অর্থবহ, উজালা, মধুর। আর “All good things come to those who wait.” ঠিক আছে, সবুরে মেওয়া ফলে, আবার এও ঠিক যে  “Time and tide wait for none.”। সুতরাং অপেক্ষা করতে করতে উপযুক্ত সময় চলে গেলে বরাবর মজা মিলে না। জীবনটাই সীমিত সময়ের মাঝে। এবং “দূরে থাকলে মায়া বাড়ে” ঠিক দেখা যায় অনেকের বেলায়, ওদিকে অনেকে “দূরে গেলে সরে যায়, ভুলে যায়”। ভুলে যাওয়ার যুক্তিও হালকা না। মানে, কারও জন্যে এটা ঠিক, কারও জন্যে ওটা ঠিক। মানে এগুলো ওগুলোর বিরোধী না। এগুলো দেখায় এক ধরনের বাস্তবতা, ঐগুলো দেখায় আরেক ধরনের বাস্তবতা। এতে বাস্তবতার সবদিক সামনে আসে, আসতে হয় বলেই।